Menu

কাহালুতে বিদেশীদের জন্য তৈরী হচ্ছে কুটির শিল্পের নানা সৌখিন জিনিসপত্র

মুনসুর রহমান তানসেন কাহালু থেকেঃ বগুড়ার কাহালু উপজেলার পাইকড় ইউনিয়নের পাঁচখুর গ্রামে তৈরী হচ্ছে বিদেশীদের জন্য কুটির শিল্পের সৌখিন প্রায় ১৫০ প্রকারের জিনিসপত্র। এই গ্রামে প্রায় ৩০০ বসবাসকারী পরিবারের সবাই বুদ্ধির পর থেকে বংশ পরম্পরায় কুটির শিল্পের জিনিসপত্র তৈরী করে আসছেন। তাল গাছের ঢিঙ্গা থেকে বের করা আঁশ দিয়ে কুটির শিল্পের হরেক রমক জিনিসপত্র তৈরীতে এই গ্রামের সবাই পারদর্শী।
সাংসারিক ছোটখাটো কাজে ব্যবহারে জন্য ও ঘরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য তারা এই সৌখিন জিনিসপত্র তৈরী করে বিক্রি করেন। তাদের কাছ থেকে কুটির শিল্পের যেকোন ধরণের জিনিসপত্র তৈরী করে নিতে চাইলে, তারা মুহুর্তের মধ্যেই সেই জিনিসপত্র তৈরী করে দিতে পারেন। সৌখিন জিনিসপত্র তৈরীতে এখানকার কারিগররা খুবই দক্ষ হওয়ায় বিভিন্ন সংস্থার লোকজন এখানে বিদেশীদের জন্য কুটির শিল্পের সৌখিন জিনিসপত্র তৈরীর অর্ডার দেন। অর্ডার পাওয়া জিনিসপত্র নিখুঁতভাবে তৈরী হয় এই গ্রামের প্রতিটি ঘরে ঘরে।
কুটির শিল্পকে কালের বিবর্তনে যতই অবমুল্যায়ন করা হোক-না কেন-এই শিল্পই আমাদের প্রাচীন বনিক সমাজের শৈল্পিক সূতিগার ছিলো। প্রাচীনকালে আমাদের গ্রাম বাংলার সাধারণ মানুষের শৈল্পিক সৃজনী ক্ষমতার প্রতিফলন হিসেবে বিকশিত হয় এই কুটির শিল্প। যান্ত্রিক সভ্যতার যুগে এসে হস্তশিল্পের কিছুটা জৌলস হারালেও গ্রাম-বাংলায় এই শিল্প এখানে এখনো অমলিন। প্রাচীন ঐতিহ্য কুটির শিল্পের বিকাশ ঘটে গ্রাম-বাংলার বিভিন্ন উৎসব, পূজা-পার্বন ও গ্রামীণ মেলার বহুমাত্রিক আয়োজনকে ঘিরে।
বর্তমানে ধর্মীয় গোঁড়ামীর কারণে গ্রাম-বাংলার বহুমাত্রিক আয়োজনে কিছুটা ভাটা পড়লেও ভাটা পড়েনি এখানকার কুটির শিল্প ও হস্তশিল্পের কাজ। আবহমান গ্রাম-বাংলার চিরায়িত এই কুটির শিল্প ও হস্তশিল্পই এখন অনেক মানুষের কাছে সমুজ্জল আর্থিক চালিকা শক্তি। এই চালিকা শক্তির মাধ্যমে দেশে-বিদেশে পরিচিতি লাভ করছে বাঙ্গালীর প্রাচীন সভ্যতার এই কুটির শিল্প।
এই গ্রামের প্রতিটি ঘরেই সারা বছর চলে কুটির শিল্প ও হস্তশিল্পের কাজ। এখানকার বেশিরভাগ পুরুষ মানুষই বিদেশে কাজ করেন। যারা বিদেশ থাকেন তাদের মাধ্যমেই এখানে নিখুঁত হাতের ছোঁয়ায় তৈরী কুটির শিল্পের হরেক রকম জিনিসপত্র বিদেশীদের কাছে পরিচিতি লাভ করে। বর্তমানে বিডি ক্রিয়েশন একটি সংস্থার মাধ্যমে বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে যায় এখানকার সৌখিন কুটির শিল্পের জিনিসপত্র।
করোনায় কিছুটা এই শিল্পের কাজ থমকে গেলেও করোনার সংক্রমণ কমে যাওয়ায় আবার এই শিল্পের কাজ এখানে বেশ পুরোদমে চলছে। এই গ্রামের বৃদ্ধ মোতালেব জানান, তিনি বুদ্ধির পর থেকেই এই কাজ করছেন। তারমতে পূর্বপুরুষেরা তাদেরকে বলে যেতে পারেনি কত বছর আগে থেকে এই গ্রামের কুটির শিল্পের কাজ শুরু হয়েছে। তার ধারণামতে প্রাচীনকালে যখন বিভিন্ন দেশের মানুষের এই অঞ্চলে বিভিন্ন তিথিপর্বে আগমন ঘটেছিলো সেই সময় থেকে এখানে কুটির শিল্পের বিকাশ ঘটে।
মোছাঃ রওশন আরা (৫৫) জানান, এখানে তিনি বধু হয়ে আসার পর থেকেই শশুড়ালয়ের লোকজনের কাছ থেকে শিখে এই কাজ করছেন। রাজিয়া খাতুন (৩০) জানান, এই কাজ করে তিনি প্রতিদিন ৪০০ টাকা পর্যন্ত উপার্জন করতে পারেন। মুঞ্জয়ারাসহ এই গ্রামের অধিকাংশ কারিগর জানান, তাদের গ্রামের ইউসুফ আলী সাবান ও তার স্ত্রী আছিয়া বিবি আমাদের গ্রামের সবার কাছ থেকে পাইকারী দরে কুটির শিল্পের জিনিসপত্র কিনে বিডি ক্রিয়েশন সংস্থার কাছে দেন। বিডি ক্রিয়েশন তাদের কমিশন দিয়ে বিভিন্ন প্রকারের সৌখিন জিনিসপত্র বিদেশে পাঠায়।
এছাড়াও বৈশাখী মেলা ও পূজা-পার্বনসহ বিভিন্ন উৎসবের জন্য এখানকার তৈরী কুটির শিল্পের জিনিসপত্র সরবরাহ করা হয়। এই গ্রামের এস এস সি পরীক্ষার্থী জান্নাতি জানান, আমি কুটির শিল্পের প্রায় ৫০ প্রকারের জিনিসপত্রের ডিজাইন করতে পারি। আমার বাবা বিডি ক্রিয়েশন সংস্থার কাছে সৌখিন জিনিসপত্র সরবরাহ করেন। তাদের চাহিদার জিনিসপত্রের ডিজাইন আমি নিজেই করে থাকি। আছিয়া ও সাবান জানান, আমাদের এই গ্রামে ১৫০ প্রকারের বেশী জিনিসপত্র তৈরী হয়। এখানে ১০ টাকা থেকে শুরু করে ৩০০ টাকা মুল্যবানের সৌখিন জিনিসপত্র তৈরী হয়।
এখানে তৈরী উল্লেখযোগ্য জিনিসপত্রের মধ্যে রয়েছে বাসা-বাড়ি ও বিভিন্ন যানবাহনের জন্য প্রায় ২০ প্রকারের ম্যাট। ছোটখাটো কাজে ব্যবহারের জন্য ও ঘরে সাজিয়ে রাখার জন্য বিভিন্ন ধরনের সৌখিন জিনিসপত্র। যেমন ঝুঁড়ি, পান ডাবড়ি, নামাজ পড়া টুপি, সাহেবী টুপি, লাভ টুপি, খাবার ঢেকে রাখার ঝাপনী, টিফিন বাটি, ডায়নিং টেবিলের মাট, ডালা, ফুডকাপ, স্যালিন্ডার, শিশুদের খেলনাসহ হরেক রকমের জিনিসপত্র। তারমতে প্রকারভেদে তিনি বিডি ক্রিয়েশনে দেওয়া জিনিসপত্রের কমিশন হিসেবে প্রতিটি জিনিসের উপর ২ টাকা থেকে শুরু করে ৫ টাকা পর্যন্ত কমিশন পান। বিডি ক্রিয়েশনের মাধ্যমে এই গ্রামের কুটির শিল্পের সৌখিন জিনিসপত্র বিশ্বের প্রায় ২৫ টি দেশে যায়।
এদিকে এই গ্রামের বেশীরভাগ মানুষের আক্ষেপ তাদের পুর্ব-পুরুষদের রেখে যাওয়া গ্রাম-বাংলার প্রাচীন সভ্যতার ঐতিহ্য দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে দিলেও তাদেরকে সরকারিভাবে কোন সহযোগীতা করা হচ্ছেনা। এই গ্রামের কারিগররা জানান, আমাদের কুটির শিল্প ও হস্তশিল্পের প্রসারে যদি সরকারিভাবে সহযোগীতা করা হয় তাহলে আমাদের তৈরী কুটির শিল্পের জিনিসপত্র গোটা বিশ্বের সৌখিন মানুষদের কাছে বাণিজ্যিকভাবে সরবরাহ করা যাবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমাদের কুটির শিল্পের জিনিসপত্র সরবরাহ হলে এই শিল্পের প্রতি অনেকের আগ্রহ বাড়বে এবং অনেকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারবে।
উপজেলা চেয়ারম্যান আল হাসিবুল হাসান সুরুজ জানান, যেহেতু ও পাইকড় ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ মিটু চৌধুরী জানান, যেহেতু এখানে তৈরী কুটির শিল্পের জিনিসপত্র বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে সেই কারণে তৈরীকারকদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে আরও দক্ষ কারিগর হিসেবে গড়ে তোলা হবে। ইতিমধ্যে সিরাজগঞ্জের একটি সংস্থার সাথে আমাদের কথা হয়েছে খুব শিঘ্রই পাঁচখুর গ্রামের কারিগরদের পর্যাক্রমে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা সার্বিক সহযোগীতা করবো।

No comments

Leave a Reply

four × two =

সর্বশেষ সংবাদ