Menu

কাহালুর অর্ধশত জ্যৈষ্ঠ জামাই মেলার ইতিবৃত্ত

মুনসুর রহমান তানসেন কাহালু থেকেঃ প্রাচীনকাল থেকেই বগুড়ার কাহালু উপজেলার বিভিন্ন স্থানে পুরো জ্যৈষ্ঠ মাস জুড়েই বেশ কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। করোনা মহামারীর কারনে গত দু-বছর ধরে এই ঐতিহ্যবাহী মেলাগুলো করতে পারেনি স্থানীয় আয়োজকরা । মহামারী করোনা পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠায় গত রবিবার থেকে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে একদিনের এই জ্যৈষ্ঠ জামাই মেলাগুলো শুরু হয়েছে। জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে শুরু করে শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় এই মেলাগুলো বসে। বিগত বছরে অনুষ্ঠিত হওয়া মেলার সংখ্যা থেকে ধারনা করা হচ্ছে এবছর জ্যৈষ্ঠ মাস জুড়ে বিভিন্ন স্থানে প্রায় অর্ধশত ঐতিহ্যবাহী জ্যৈষ্ঠ জামাই মেলার আয়োজন করা হতে পারে। কালের বিবর্তনে এই মেলাগুলোর নাম পরিবর্তন হয়ে বর্তমানে এই মেলার নাম হয়েছে জ্যৈষ্ঠ জামাই মেলা। এই জনপদের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী মেলাগুলোর ইতিবৃত্ত সম্পর্কে অনেকেরই ধারনা নেই। তবে প্রবীণজনদের কাছে শোনা গল্প এবং বিভিন্নভাবে অনুসন্ধান করে ধারনা পাওয়া যায়, মেলাগুলোর পূর্বে নাম ছিলো মাদার পীরের মেলা। হারুত-মারুতের কথিত কথায় না গিয়ে মাদার পীরের অনুসারীদের মতে যাকে মাদার বলা হয় তিনি একজন মারফতি পীর। এক সময় এই মারফতি পীরের অনেক অনুসারী ছিলেন এই জনপদে। জনশ্রæতি রয়েছে চুল জটাধারী নারী-পুরুষের আনাগোনা ছিলো অত্র উপজেলায়। চুল জটাধারীরা একটি নিদ্রিষ্ট স্থানে ধ্যান-সাধনায় মগ্ন থাকতেন। জটাধারীদেরকে মাদার পীর বলতেন এবং তাদেরকে অধ্যাত্বিক জ্ঞানের অধিকারী হিসেবে জানতেন অনুসারীরা। যারফলে অসুখ-বিসুখ এবং বিপদে-আপদে পড়ে এই জটাধারীদের শরণাপন্ন হতেন ভক্তরা। পরবর্তী সময়ে মাদার পীরকে অনুসরন করেই বসানো হতো মাদার পীরের মেলা। মাদার পীরের মেলা থেকে পরিবর্তিত নামে আসে নিশানের মেলা। যখন বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে বৃষ্টি হতোনা তখন প্রকৃতির সাহায্য নিতে বৃষ্টির জন্য আরাধনার আসরস্থলই হয় নিশানের মেলা। নিশানের মেলার পূর্বে আয়োজকরা দল বেঁধে গ্রামে গ্রামে গিয়ে নেচে গেয়ে মানুষের কাছ থেকে চাল-ডাল ও নগদ অর্থ আদায় করতেন। এরপর তারা লম্বা বাঁশের মাথায় লাল শালু টাঙ্গিয়ে মেলা বসিয়ে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করতেন। প্রার্থনা শেষে ধুমধাম করে সকলের মাঝে বিতরণ করা হতো ছিন্নি। নিশানের মেলা থেকে পরিবর্তিত হয়ে আসে জ্যৈষ্ঠ মেলা। জ্যৈষ্ঠ মাস জুড়েই বিভিন্ন স্থানে মেলাগুলো হওয়ায় এই মেলাগুলো জ্যৈষ্ঠ মেলা নামে বেশী পরিচিতি লাভ করে। জ্যৈষ্ঠ মেলা থেকে পরিবর্তিত হয়ে আসে জ্যৈষ্ঠ-জামাই মেলা। কালের পরিবর্তনে জ্যৈষ্ঠ জামাই মেলা নামে এই মেলাগুলো পরিচিত হওয়ায় পিছনে অনেক যৌতিক কারনও রয়েছে। জ্যৈষ্ঠ-জামাই মেলা উপলক্ষে মেলার আশে-পাশের গ্রামগুলোর প্রতিটি বাড়িতে বিশেষ করে মেয়ে জামাইয়ের আগমন ঘটে। গরীব-ধনী বলে কথা নয় সাধ্যমত প্রতিটি বাড়িতে আমন্ত্রণ জানানো হয় মেয়ে-জামাইসহ নিকট আতœীয়দের। এই জ্যৈষ্ঠ-জামাই মেলা উপলক্ষে আশে-পাশের গ্রামের প্রতিটি বাড়ি আতœীয়-স্বজনের ভীরে সরগরম হয়ে উঠে। এই সময় ধনী-গরীবসহ প্রায় সব শ্রেণিপেশার মানুষের হাতেই থাকে টাকা-পয়সা। বোরো ধান ঘরে তুলবার পর ধান বিক্রির টাকা তাইতো দু-হাতে খরচা করে সবাই। মেলা উপলক্ষে জামাই-মেয়ে, আতœীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিতজনদের আপ্যায়নে একপ্রকার প্রতিযোগীতা চলে প্রতিটি পরিবারে। যারফলে জ্যৈষ্ঠ-জামাই পরিনত সকল শ্রেণিপেশার মানুষের মিলন মেলা। আবহমান গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য ফুটে উঠে এই জ্যৈষ্ঠ-জামাই মেলাগুলোতে। এই মেলাগুলোকে ঘিরে লক্ষ্য করা গেছে এখানে ধর্ম-বর্ণে কোন মানুষের মধ্যে নেই ভেদাভেদ। আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়ে সকল বর্ণের মানুষের মাঝে সৃষ্টি হয় সম্প্রীতির এক মহামিলন মেলা। বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য সকল বর্ণের মানুষের সম্প্রীতিতে ফাটল ধরাতে যুগে যুগে মৌলবাদীরা পরিকল্পিতভাবে ধর্মের বাঙালির সংস্কৃতির বিভিন্ন উৎসব পালনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। ধর্মান্ধতা, ক্যু-সংস্কারসহ মানুষে মানুষে ভেদাভেদ দুর করার ক্ষেত্রে এই ধরনের বাঙালির সম্প্রীতির ঐতিহ্যবাহী মেলাসহ সৃজনশীল সব ধরনের বিনোদন মূলক বেশী করে করা উচিত। বিজ্ঞজনদের মতে অনেক মানুষ তাদের সন্তানদের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড, বাঙালির ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন অনুষ্ঠান সম্পৃক্ত না করার কারণে তাদের মধ্যে ধর্মান্ধতা, ক্যু-সংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস বিরাজমান। তাই প্রত্যেক অভিভাবের উচিত আগামীদিনের ভবিষ্যৎ তাদের সন্তানদের ভালো মানুষ হিসেবে তৈরী করতে বাঙালির সংস্কৃতির সকল ধরনের অনুষ্ঠানে সম্পৃক্ত করা।

No comments

Leave a Reply

4 × three =

সর্বশেষ সংবাদ