Menu

কাহালুর জ্যৈষ্ঠ জামাই মেলা বাঙ্গালীদের অন্যতম একটি উৎসব

সোনাতলা সংবাদ ডটকম (মুনসুর রহমান তানসেন, কাহালু): বাঙ্গালীর হাজারের বছরের সংস্কৃতি পর্যালোচনা করলে অনুমান করা যায় ষড় ঋতুর এই দেশে বছরে নানান উৎসবে মেতে উঠেন সকল বর্ণের মানুষ। ঈদ, পূজা-পার্বন, বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব ছাড়াও বিশেষ করে ঋতুকে ঘিরেই বাঙ্গালীরা বেশীরভাগ উৎসব পালন করে থাকেন। ধর্মীয় সকল উৎসব ও ঋতু কেন্দ্রিক সকল উৎসব গুলোই হাজার বছর ধরে বহন করছে বাঙ্গালীর সম্প্রীতির বার্তা। বাঙ্গালীর চিরায়িত বিভিন্ন উৎসবের ন্যায় অত্র উপজেলায় জ্যৈষ্ঠ জামাই মেলা গুলোও বাঙ্গালীর অন্যতম একটি সম্প্রীতির উৎসব। প্রতি বছর এখানে মধুমাস জ্যৈষ্ঠের প্রথম সপ্তাহ থেকে আষাঢ় মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত প্রায় অর্ধশত একদিনের জ্যৈষ্ঠ জামাই মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে । এই মেলা গুলোকে ঘিরে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের প্রতিটি ঘরে ঘরে উৎসবের ধুম পরে যায়। প্রতি বছরই এখানে মেলা দেখার জন্য ছুটে আসে স্রোতের মতো নানা বর্ণের মানুষ। এবছর জ্যৈষ্ঠ মাসের মধ্যে যোগ হয়েছে পবিত্র রমযান মাস। যারফলে এবছর জ্যৈষ্ঠ জামাই মেলা আয়োজনের ক্ষেত্রে ভাটা পরেছে অনেকটা। রমযান মাসের মধ্যে বেশ কিছু মেলার দিনক্ষন থাকলেও নিদ্ধারিত দিনে অনেক মেলাই এবার অনুষ্ঠিত হয়নি। রমযান মাসের মধ্যে কোনো কোনো স্থানে মেলার আয়োজন করা হলেও অতিতের মতো সেই মেলা গুলো জমাতে পারেনি। তবে ঈদের পরে পাঁচপীর, জামগ্রাম ও পাবহারা গ্রামে জ্যৈষ্ঠ জামাই মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এই তিনটি মেলার খোজ-খবর নিয়ে দেখা গেছে মেলা গুলো খুবই জমজমাট ছিলো। প্রশাসন ও পুলিশের নজরদারীতে মেলা গুলোতে ছিলোনা কোনো জুয়ার আসর বা অনৈতিক কর্মকান্ড। যারফলে এই সৃজনশীল মেলা গুলোতে ছিলো নারী-পুরুষসহ সব বয়সী মানুষের সরব উপস্থিতি। মেলার আশে-পাশের গ্রাম গুলোতে মানুষের মধ্যে ছিলো দারুন উৎসবের আমেজ। ধনী-গরীব বলে কথা নয় প্রতিটি বাড়িতে অতিথি আপ্যায়নে ছিলোনা কোনো ঘাটতি। এদিকে পবিত্র রমযান মাসে অনেক স্থানে নিদ্ধারিত সময়ে মেলার আয়োজন করতে না পারায় আয়োজকরা আষাঢ় মাসে সেই মেলা গুলো আয়োজনের প্রস্ততি নিয়েছেন। ইতিমধ্যে বিভিন্ন স্থানে জ্যৈষ্ঠ জামাই মেলা আয়োজনের জন্য মাইকিং করা হচ্ছে। বংশ পরম্পরায় বাঙ্গালীরা নানান উৎসব পালন করে থাকেন একেবারে অন্তর থেকে। জ্যৈষ্ঠ-জামাই মেলা আয়োজনে রমযান মাসের কারনে খানিকটা ছন্দ-পতন হলেও শত শত বছর আগের এই মেলা গুলোর ধারাবাহিকতা রক্ষায় এখনো আয়োজকদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এই মেলা গুলোর গোড়াপত্তনের সঠিক ইতিহাস পাওয়া না গেলেও এলাকায় জনশ্র“তি রয়েছে মাদারপীরের স্বরণে এই মেলা গুলো আগে অনুষ্ঠিত হতো।সাধারন মানুষের জনশ্র“তি থেকে অনুমান করা হয় এক ধরনের জটাধারী মহিলার বাস ছিলো কোনো কোনো গ্রামে। সেই মহিলারা ছিলো আধ্যত্ত্বিক জ্ঞানের অধিকারী। শত শত বছর পূর্বে বিপদে-আপদে এবং অসুখ-বিসুখে এই অঞ্চলের মানুষের একমাত্র ভরসা ছিলো এই চুল জটাধারী মহিলারা। জনশ্র“তি রয়েছে বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষ জটাধারী মহিলাদের মাদারপীর হিসেবে ভক্তি করতো। ভক্তরা মাদারপীরকে স্বরণ করতেই এক সময় এই মেলা গুলোর গোরাপত্তন করেছিলো। এই মেলা গুলো নিয়ে আরো এক ধরনের জনশ্রতি রয়েছে। সেই জনশ্র“তির সাথে মেলা আয়োজনে অনেকটা মিলও পাওয়া যায়। বৃষ্টিপাতের অভাবে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে যখন খরায় মাঠ-ঘাট শুকে যেত তখন গ্রামের সাধারন মানুষ বৃষ্টির জন্য আরাধনা করতো । অনেকে বিভিন্ন গ্রামে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নেচে-গেয়ে ধান-চাল ও টাকা-পয়সা আদায় করতো। তারা মাঠের মধ্যে ফাঁকা জায়গায় লম্বা বাঁশের মাথায় লাল শালু লাগিয়ে নিশান টাঙ্গাতো। মানুষের বাড়ি থেকে আদায় করা চাল-ডাল দিয়ে তারা নিশানের কাছেই রান্না-বান্না করে সবাই মিলে খেয়ে-দেয়ে বৃষ্টির জন্য আরাধনা করতো। যেখানে নিশান টাঙ্গানো হতো সেখানেই পরবর্তিতে নিশানের মেলা লাগানো হতো। অত্র উপজেলার বিভিন্ন স্থানে এই মেলা গুলো এখনো কিছু মানুষের কাছে নিশানের মেলা হিসেবেই পরিচিত। কালের বিবর্তনে মাদারপীর কিম্বা নিশানের মেলার কথা অনেকেই ভুলে গেলেও পরিবর্তিত নামে সেই মেলা গুলো এখনো অনুষ্ঠিত হয়। মধুমাস জ্যৈষ্ঠকে ঘিরে এখানে বেশীরভাগ মেলা অনুষ্ঠিত হওয়ায় মেলার নাম পরিবর্তন হয়ে জ্যৈষ্ট মেলা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। মেলাকে ঘিরে বিশেষ করে জামাই-মেয়েকেই বেশী আমন্ত্রন করা হয়। যারফলে জ্যৈষ্ঠের সাথে জামাই যোগ করে এই মেলা গুলোর নাম হয়ে যায় জ্যৈষ্ঠ জামাই মেলা। প্রবীনজনদের কাছে মেলা গুলোর আগের কিছু ইতিহাস জানা থাকলেও বর্তমানে নতুন প্রজন্মের কাছে সেই ইতিহাস নেই। তবে নতুন প্রজন্মের কাছে এই মেলা গুলো জ্যৈষ্ঠ-জামাই মেলা হিসেবেই বেশী পরিচিত।

No comments

Leave a Reply

12 − nine =

সর্বশেষ সংবাদ