Menu

কাহালুর পাঁচখুর গ্রামের মানুষ সৌখিন জিনিসপত্র তৈরী করে উন্নতির পথে

সোনাতলা সংবাদ ডটকম (কাহালু প্রতিনিধি): বগুড়ার কাহালু উপজেলার পাইকড় ইউনিয়নে রয়েছে ইতিহাস আর ঐতিহ্যের নানা স্বাক্ষর। এখানে কালের নীরব স্বাক্ষী হয়ে এখনো মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে আছে পুরাকৃর্তির বহু নিদর্শন। জানা গেছে পালবংশের শাসন থেকে শুরু করে ভারত বিভক্তির আগ মুহুর্ত পর্যন্ত এখানকার শালবাহন রাজবাড়ি, যোগীর ভবন আশ্রম-মন্দিরসহ বিভিন্ন তীর্থস্থানে ছিলো দেশ ছাড়াও ভিনদেশী নানা বর্ণের মানুষের পদচারণা। যখন ভিনদেশীদের আনাগোনা ছিলো তখন মূলত তাদের জন্যই পাইকড় ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রামে মানুষ তালপাতা ও তাল গাছের ঢিঙ্গার আঁশ থেকে পাখাসহ বিভিন্ন প্রকারের সৌখিন জিনিসপত্র তৈরী করতো। বার মাসে তের পার্বনের এই বঙ্গদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যের মধ্যেই পরে এখানকার মানুষের নিজ হস্তে কুটির শিল্পের সৌখিন জিনিসপত্র তৈরীর ইতিহাস। কাহালু উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৩ কিঃ মিঃ দক্ষিনে একেবারে পল্লী এলাকায় একটি গ্রামের নাম পাঁচখুর। বছর খানিক আগেও এই গ্রামে প্রবেশের সকল রাস্তা ছিলো মেঠোপথ। বর্তমানে মেঠোপথ গুলো পাকাকরনের কাজ চলছে। রাস্তার দু-ধারে সাজানো গোছানোর মতো সাড়ি সাড়ি তালগাছ। প্রতিটি রাস্তার দুধারের তালগাছের রহস্য খুজতে গিয়ে বেড়িয়ে আসে পাঁচখুর গ্রামের মানুষের জীবন-জীবিকার অজানা ইতিহাস। এই গ্রামে প্রায় পাঁচ শতাধিক পরিবারের বসবাস। এখানে সবাই বংশ পরম্পরায় তালগাছের ঢিঙ্গা থেকে বের করা আঁশ দিয়ে তৈরী করে কুটির শিল্পের সৌখিন জিনিসপত্র। যারা এখানে নববধু হিসেবে আসেন তারাও অল্পদিনের মধ্যে এই কাজের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যান। পাঁচখুর গ্রামের বকুল খন্দকার (৪০) জানান, বুদ্ধির পর থেকেই তিনি তাদের পূর্ব-পুরুষদের মতো কুটির শিল্পের জিনিসপত্র তৈরী করে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। তিনি বর্তমানে বিভিন্ন এলাকার ধনী লোকদের কাছ থেকে সৌখিন জিনিসপত্র তৈরীর অর্ডার নিয়ে থাকেন । তার অর্ডারী জিনিসের মধ্যে রয়েছে ডায়নিং টেবিলে পাতিল, বাটি, থালা রাখার জন্য মাট ও সরা অন্যতম। এছাড়াও তিনি ধনী পরিবারের লোকজনের জন্য সাহেবী টুপিও তৈরী করে থাকেন। সেখানকার গৃহবধু আছিয়া (৩৪) ও সেলিনা (৩৬) জানান, তারা এই গ্রামে নববধু হয়ে আসার মাস খানিক পর থেকেই কুটির শিল্পের জিনিসপত্র তৈরীর কাজে নিয়োজিত হন। জাহানারা (৫৫) জানান, মাত্র ১০ বছর বয়সে তিনি কুটির শিল্পের বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরী করা শিখেন। সেই থেকে তিনি সংসারের কাজকর্ম করার পাশাপাশি বাড়তি আয়ের জন্য এই কাজ গুলো করছেন। হাফছা বর্তমানে অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী। লেখাপড়ার পাশাপাশি হাফছাও এই হস্ত শিল্পের কাজ গুলো করে কিছু টাকা আয় করছে। হাফছা জানায়, মাত্র ৮ বছর বয়সে কুটির শিল্পের ছোট-খাটো কাজ গুলো সে শিখেছে। পাঁচখুর গ্রামে গিয়ে খোজ খবর নিয়ে দেখা গেছে সেখানে শতভাগ পরিবারের লোকজনই তাল গাছের ঢিঙ্গা থেকে বের করা আঁশ দিয়ে সৌখিন জিনিসপত্র তৈরী করছেন। তাদের তৈরী করা জিনিসপত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিভিন্ন সেট, টুপি, সাহেবী টুপি, পানের ডাবরী, ঝুড়ি, ফুলদানী, মাট, পাপস স্কয়ার বক্স, খাবার ঢেকে রাখার সড়াসহ বিভিন্ন আইটেমের জিনিস। তৈরী কারকদের তথ্য মতে প্রকারভেদে ১০ টাকা থেকে শুরু করে তারা ৩০০ টাকা মুল্যের জিনিসও বিক্রি করেন এবং অর্ডার নিয়ে থাকেন। এই গ্রামের অনেক মানুষ কুটির শিল্পের কাজ করে টাকা জমিয়ে বিদেশও গেছে। যারা বিদেশ থাকে তাদের মাধ্যমে কুটির শিল্পের জিনিসপত্র বিভিন্ন দেশেও সরবরাহ করা হয়। পাঁচখুর গ্রামের একাধিক ব্যক্তি জানান, তাদের তৈরী করা জিনিসপত্র বিক্রির জন্য বাজার খুজতে হয়না। ধনী পরিবারের লোকজন ও ব্যবসায়ীরা এই গ্রামে ছুটে আসেন কুটির শিল্পের সৌখিন জিনিসপত্র কেনার জন্য। শুধু জিনিসপত্র কেনার জন্যই আসেনা তারা বেশী দামী জিনিসপত্র তৈরী করার অর্ডারও দিয়ে যান। তাদের তথ্যমতে রাজধানী ঢাকাসহ ধনী পরিবারের অর্ডারের জিনিসপত্র তৈরী করে বাড়তি আয়ের মাধ্যমে তারা বর্তমানে উন্নত জীবন যাত্রার পথে। এই গ্রামের প্রবীনজনরা জানান, এই গ্রামের কোনো মানুষের আর অভাব নেই। কুটির শিল্পের জিনিসপত্রের জাহিদা অনেক বেড়েছে। সকলেই কুটির শিল্পের জিনিসপত্র তৈরী করে ভালো আয় করেছে। সেই সাথে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থে এই গ্রামের বেশীরভাগ পরিবারের ভাগ্য পরিবর্তন হয়েছে এবং তারা উন্নত জীবন যাপন করছে।

No comments

Leave a Reply

three × four =

সর্বশেষ সংবাদ