Menu

কাহালুর সফল ডেইরী খামারী সামসুল মাস্টারঃ কঠোর পরিশ্রম করে এখন জিরো থেকে হিরো

সোনাতলা সংবাদ ডটকম (মুনসুর রহমান তানসেন, কাহালু): কঠোর পরিশ্রম আর ইচ্ছাশক্তি মানুষকে উন্নতির চরম শিখরে পৌছে দেয়। সেই বিশ্বাস নিয়েই কাহালু উপজেলার আড়োলা গ্রামের সামসুল ইসলাম মাস্টার কঠোর পরিশ্রমে অর্থনৈতিকভাবে জিরো থেকে হিরো হয়েছেন। প্রতিদিন অভাব-অনটনের সাথে লড়াই করে কোনোমতে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করা সেই সামসুল মাস্টার এখন সফল ডেইরী খামার মালিক।

সকল প্রকারের অভাব-অনটন দুর করে তিনি এখন উন্নতির চরম শিখরে। সামসুল মাস্টার আড়োলা গ্রামের আছতুল­্যার ছেলে। ছাত্র জীবনে তার পিতার সংসারে অভাব-অনটন ছিলো নিত্যদিনের সঙ্গী। সেই টানা-পোড়নের সংসারে থেকেই খুবই কষ্টে বিএ পাশ করেন সামসুল মাস্টার। ওই সময় বিভিন্ন দপ্তরে দিনের পর দিন ধর্না দিয়েও একটি ছোট-খাটো চাকুরী মেলাতে পারেননি তিনি।

১৯৯২ সালে তিনি বিয়ে করেন শিবগঞ্জ উপজেলার ছাতুয়া গ্রামের রশিদা আক্তার নামের এক শিক্ষিত মেয়েকে। বিয়ের পর স্বামী স্ত্রী দুজনেই খন্ডকালিন ব্র্যাক স্কুলে শিক্ষকতার চাকুরী নেয়। ওই সময় দুজনের সর্বমোট বেতন ছিলো মাত্র ১ হাজার টাকা। সেই টাকা দিয়ে সংসার ঠিকমত চলত না। বাড়ির কিছু জিনিসপত্র ও স্ত্রী রশিদার গহনা বিক্রি করে খুবই কষ্ট করে ১৭ হাজার টাকা সংগ্রহ করে একটি গাভী কিনেন সামসুল মাস্টার। সেই গাভীর বাছুর হলে, দুধ বিক্রি করা টাকা এবং দুজনের বেতনের টাকায় তাদের সংসারের কিছুটা অভাব কমে যায়।

১৯৯৪ সালে সামসুল মাস্টার স্থানীয় শিক্ষিত কিছু ব্যক্তির সহযোগীতায় আখরাইল রেজিঃ বে-সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। সেই বিদ্যালয়ে প্রায় ১২ বছর বিনা বেতনে চাকুরী করেন তিনি। বিদ্যালয়টি এমপিও ভুক্ত হওয়ার পর ২০০৬ সালে যখন বেতন হয়, তখন আর পিছনে তাকাতে হয়নি তাকে। এদিকে তার বাড়িতেও গাভীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। চাকুরীর বেতন আর খামারের আয় দিয়ে উন্নতির পথে ধাবিত হতে থাকেন তিনি।

সামসুল মাস্টার জানান, নানা প্রতিবন্ধতার মধ্যেও তার স্ত্রী ও ছেলে-মেয়ের পরিশ্রমে তিনি একটি ভালো ডেইরী খামার করেছেন। ডেইরী খামারের প্রায় ৩০ টি গরুর মধ্যে ১৫ টি গাভী ও ১৫ টি বুকনা গরু রয়েছে। এই গরু গুলো তার কেনা নয়, সব গুলো প্রথমে কেনা একটি গরু থেকেই হয়েছে। তিনি খামারে কোনো সাঁড় গরু রাখেননি। সাঁড় গরু হলে গাভীর দুধ ছারলে তা বিক্রি করে সংসারের আয়-উন্নতি করেন।

তিনি প্রায় ৭ শতক জায়গার উপর প্রায় ৩৫ লাখ টাকা খরচ করে একটি ভবন নির্মাণ করেছেন। সেই ভবনের নীচতলা গরুর খামার। আর উপরে তিনি পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করেন। তার এই খামারে গাভী থেকে দুধ নামানো হয় আধুনিক মেশিনে। খর কাটার মেশিন ও জেনারেটর থেকে শুরু করে একটি খামারে যা যা প্রয়োজন তার খামারে সবই রয়েছে। শুধু তাই নয় একজন দক্ষ খামারীর যা গুণাবলী থাকা দরকার তার সব অভিজ্ঞতায় রয়েছে সামসুল মাস্টারের। গরু পালনে তার সফলতার পিছনে আরো একটি বড় শক্তি কাজ করেছে তার ছিলো প্রশিক্ষন। গরু পালন ও গরুর চিকিৎসার উপরে তিনি যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে নিয়েছিলেন প্রশিক্ষন।

জানা গেছে তার ১৫ টি গাভী প্রতিদিন গড়ে ১০০ লিটার দুধ দেয়। প্রতিদিন গরুর খাবার ও ওষুদপত্র মিলে তার খরচ হয়, আড়াই হাজার টাকা। খামারের খরচ বাদ দিয়ে প্রতিদিন দুধ বিক্রির দেড় হাজার টাকা আয় হয়। অপরদিকে সাঁড় গরু হলে সেগুলো বিক্রি করে মোটা অংকের টাকা পায়। এই টাকা জমিয়ে তিনি জমি কিনেছেন প্রায় ৫ বিঘা। এদিকে তার প্রতিষ্ঠা করা স্কুলটি ইতিমধ্যে সরকারি হয়েছে। বর্তমানে সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক তিনি। তার উন্নতির পিছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রয়েছে স্ত্রী রশিদা, ছেলে রুহুল আমিন ও কন্যা সাদিয়া আকতারের।

এই পরিবারের চারজনই কঠোর পরিশ্রম করেন খামারের গরু লালন-পালনে। শুধু তাই নয় সামসুল মাস্টারের ছেলে-মেয়ে দুজনই মেধাবী ছাত্র/ছাত্রী। ছেলে রুহুল আমিন বগুড়া সরকারি শাহ সুলতান কলেজের অনার্স ইংরেজী বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। আর কন্যা সাদিয়া আকতার একই কলেজের অনার্স অর্থনীতি বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী।

সামসুল মাস্টার ও তার স্ত্রী রশিদা জানান, এক সময় আমাদের সংসারে খুবই অভাব ছিলো। এখন আমাদের টাকা-পয়সার অভাব নেই। একটি মাত্র গরুই আমাদেরকে উন্নতির পথে নিয়ে গেছে। আমরা দুজনেই একসাথে হজ্ব করেছি। ছেলে-মেয়েরা সু-শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে। একদিন দুঃখ-কষ্টের সীমা ছিলোনা। এখন আমাদের কোনোই দুঃখ-কষ্ট নেই। আমরা ছেলে-মেয়ে নিয়ে খুবই সুখে আছি। কাহালু উপজেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ মোশারফ হোসেন জানান, অবিশ্বাস হলেও সত্য সামসুল মাস্টার মাত্র একটি গরু থেকে এখন বড় খামারীদের মধ্যে একজন।

No comments

Leave a Reply

four − 1 =

সর্বশেষ সংবাদ