Menu

ছেলে শিশু ধর্ষণ বন্ধ হবে কবে? -এম এম মেহেরুলের মন্তব্য প্রতিবেদন

সোনাতলা সংবাদ ডটকমঃ বর্তমানে সারাদেশ জুড়ে ধর্ষণ নিয়ে তোলপাড় চলছে।তোলপাড় হোক আরো,প্রতিবাদ,সমাবেশ হোক হাজার খানিক আপত্তি নেই। কিন্তু ধর্ষণ মানেই মেয়ে শিশু এই ধারণা এবং নারীদের কথাই ঘুরে ফিরে সবাই বলছে।কিন্তু এই ধর্ষণ শব্দের বিপরীতে আরেকটি ভয়ংকর ধর্ষণের ঘটনা থেকেই যাচ্ছে লোকচক্ষুর আড়ালে।সেটি নিয়ে কারো মুখে রা-টি পর্যন্ত যেমন নেই, ঠিক তেমনি মাথা ঘামাবার প্রয়োজন বোধ করেন না অনেকে।তাদের মনে প্রশ্ন ঘুরপাক খায় এও আবার হয় নাকি? অনেকে আবার সেটিকে একটু ঘুরিয়ে বলাৎকার শব্দে বিশেষায়িত করে অন্য মোড়ক দেয়ার চেষ্টা করছেন বছরের পর বছর।কিন্তু ঘটনাটি দিনদিন যেভাবে সমাজের ঘাড়ের উপর চেপে বসছে তাতে মুখে কুলূপ এটে দেয়াটাই একপ্রকার অন্যায়ের পাশাপাশি প্রকারান্তে ছেলে শিশুদের প্রতি অবিচার হিসেবে বিবেচ্য।ধর্ষণ সেতো ধর্ষণ-ই।ধর্ষণ বা যৌন হয়রানি যে কোন মানুষের জন্যই মারাত্বক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এটা হোক মেয়ে অথবা ছেলে। নারী ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতন ঠেকাতে অনেক কঠোর আইনী বিধানও রয়েছে। অথচ আমাদের সমাজে ছেলে শিশুরাও যৌন হয়রানির পাশাপাশি ধর্ষণের শিকার হয়। আমাদের সমাজ ও আইন তাদের কতটা সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে এটি বরাবরই প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যাচ্ছে?

আমাদের সমাজে ছেলে শিশুরা যৌন নির্যাতনের শিকার হলে সমাজ সেটাকে ভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করে,ঢাকঢাক গুড়গুড় করে যেকোন মূল্য তা আর বাইরে বেরুতে দেয়না বরং মাটি চাপা দেয়াকেই ফরজ কাজ মনে করে।আবার যদিও কিছু ঘটনা দৈবক্রমে মানুষের কান পর্যন্ত পৌছায় সেখানেও ধর্ষণ শব্দের পরিবর্তে বলা হয় বলাৎকার।বাংলাদেশে ২০১৭-২০১৯ সাল সময় পর্যন্ত ১১৪টি ছেলে শিশু ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে বলে খবর এসেছে। বছর জুড়ে উল্লেখযোগ্য সংবাদমাধ্যমের খবর পর্যবেক্ষণ করে এই তথ্য দিয়েছে বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম। যদিও শিশু অধিকার সংগঠনগুলো মনে করে বাস্তবে এর সংখ্যা আরো অনেক বেশি। কিন্তু ছেলে শিশুদের যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণের বিষয়টি বাংলাদেশের সমাজে বা দেশের আইনে একেবারেই গুরুত্ব পাচ্ছে না। অথচ এমন ঘটনা সমাজে অহরহ ঘটছেই, কিন্তু নেই কোন প্রতিকারের ব্যবস্থা।

কিছুদিন আগে রাজশাহীতে একটি আবাসিক এলাকায় কথা হচ্ছিলো ত্রিশোর্ধ এক যুবকের সাথে। তিনি বলছেন একের অধিকবার বার তিনি এমন ঘটনার শিকার হয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঐ যুবক বলেন “আমার বয়স তখন আট। আমরা যে বাসায় থাকতাম তার দোতলায় একটি ছেলে থাকতো। সে প্রায়ই আমাকে সিঁড়িতে চেপে ধরতো। দুই পায়ের মাঝখানে হাত দিতো। আমার খুবই খারাপ লাগতো”। সৌরভ নামে এক ভদ্রলোককে চিনি অনেকদিন। তিনি নাকি ছোটবেলায় খুব দুষ্টুমি করতেন। তাকে মনোযোগী করতে বাবা-মা তার জন্য একজন গৃহশিক্ষক রেখেছিলেন। তার দ্বারাই ভয়াভহ অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছে সৌরভের।সৌরভের কথা অনুসারে
“আমার জীবনের সবচাইতে ভয়াবহ অভিজ্ঞতাটি হয় আমার বয়স যখন ১২ বছর তখন। আমার বাবা মা আমার জন্য একজন গৃহশিক্ষক রেখেছিলেন, কারণ আমি পড়াশুনো করতে চাইতাম না। তাকে খুব মেধাবী বলে মনে করা হতো। সে আমাদের বাসায় থেকেই আমাকে পড়াতো এবং আমার সাথে এক ঘরেই তাকে থাকতে দেয়া হয়েছিলো। একদিন রাতে হঠাৎ টের পেলাম আমার সারা শরীরে কারোর হাত”। বাকি কথাটুকু বলতে গিয়ে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলেন তিনি। এর পর তিনি যা বললেন তার মর্ম হল ঐ গৃহ শিক্ষক তার উপর টানা তিনমাস নানা ধরনের যৌন নির্যাতন চালিয়েছে। ধর্ষণের শিকারও হয়েছেন তিনি। সেটি তিনি বাবা মায়ের কাছে একেবারেই বলতে পারেন নি।কিন্তু বাবা-মা বিষয়টি কখনো বুঝতেও পারেননি যে তাদের ছাদের নিচেই ছেলের উপর কি ভয়াবহ অন্যায় ঘটে গেছে।অপরদিকে পত্রিকার পাতা উল্টাতে গেলেই প্রতিনিয়তই কওমী মাদ্রাসায় ছেলে শিশু ধর্ষণের কি ভয়াবহ চিত্র আমরা দেখতে পাচ্ছি।সেখানে কিছু ভন্ড যৌন পিপাসু অল্প বয়সী ছেলেগুলোকে নানান ভয়ভীতি দেখিয়ে দিনের পর দিন ধর্ষণ করে চলেছে।সেগুলোর খবরও সিংভাগ বাইরে বেরুচ্ছে না নানান প্রভাবের কারনে। বরং সমাজের কিছু অশিক্ষিত,অর্ধশিক্ষিত মানুষ না বুঝেই সেখানে তাদের সন্তানদের পাঠায়। আমাদের সমাজে অভিভাবকেরা ছেলে সন্তানদের যৌন নির্যাতনের বিষয়টি নিয়ে মোটেও চিন্তিত নন।তার মানে ছেলেরা যে যৌন নির্যাতনের শিকার হয় সেটি নিয়ে সেভাবে ভাবছেই না বাংলাদেশের লোকজন। কিন্তু কেন বাংলাদেশে সমাজে বিষয়টি নিয়ে খুব একটা কথা হয় না?

কারণ যুগে যুগে আমরা এটাই দেখে এসেছি নারী পুরুষের মধ্যে যে বৈষম্য রয়েছে সেটি আরো শক্তিশালী করার জন্য যৌন নির্যাতনকে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ধর্ষণ যৌন নির্যাতনের মধ্যে সর্বোচ্চ একটি ধরন। এর মাধ্যমে নারীকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। আর সেটা করে পুরুষ। কিন্তু আমাদের সমাজে আমরা যে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চাইনা সেটি হল নারী শিশুকেই শুধু ব্যবহার করা হয়না। পুরুষ শিশুকেও যৌন আকাঙ্ক্ষা হাসিল করার জন্য বা যৌন উত্তেজক ছবির জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। ছেলে শিশুদের যৌন নির্যাতন নিয়ে কথাবার্তা বলার ক্ষেত্রে এমন সামাজিক অনীহার কারণে এমন ঘটনা ঘটলেও সেটির বিচার একদমই হচ্ছে না। কারণ বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে পুরুষের বা ছেলে শিশুর বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতন সম্পর্কে কিছুই বলা নেই। যদি আরো স্পষ্ট করে বলতে চান পুরুষের বিরুদ্ধে সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট হলে তার শাস্তি কি? এইভাবে বাংলাদেশে কোন আইন নেই। পুরুষকে ভিক্টিম করার জন্য কোন শাস্তি বাংলাদেশে এখনো দেয়াও হয়নি। বরং ছেলে বা কোন পুরুষ যৌন নির্যাতনের শিকার হলে তা নিয়ে কথা বললে উল্টো তাকে হাসির পাত্র হতে হচ্ছে।

কিন্তু সমাজে যদি এই অবস্থাটি চলতে থাকে অর্থ্যাত ছেলে শিশু ধর্ষণের বিষয়টি সামাজিকভাবে সামনে না আসে তবে তা সমাজের গভীরে ক্ষতের সৃষ্টি করবে।যে ক্ষত থেকে শুধুই দুর্গন্ধই বেরুবে আর সমাজ ব্যবস্থাকে করবে দূষিত।যা আমাদের কারোই কাম্য নয়।নারীর প্রতি যেমন যৌন নির্যাতন কাম্য নয় ঠিক তেমনি পুরুষের প্রতিও যৌন নির্যাতন বন্ধের দাবিটি সামনে আনতে হবে।নারী ধর্ষণের ক্ষেত্রে যেমন আমরা দলবেধে সোচ্চার হই,প্রতিবাদ জানাই ,শাস্তির দাবি করি ঠিক তেমনি ছেলে শিশু ধর্ষণের ক্ষেত্রেও সমান ভূমিকা পালন করতে হবে। আমরা সবাই ধর্ষণ কারীর শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড চাচ্ছি।বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে শুধু নারীর প্রতি যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধানের জায়গাতে নারী পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই একই শব্দে যুক্ত করে শাস্তির বিধান করা হোক। আর ছেলে শিশু নির্যাতনকে বলাৎকার না বলে বরং সেটাকেও বলা হোক ছেলে শিশু ধর্ষণ।তাহলে বোধহয় ধর্ষণের বিরুদ্ধে শাস্তির দাবিটি একই শ্রেণীভুক্ত করা যাবে।আইনের ফাকফোকর দিয়ে ছেলে শিশু ধর্ষকরা বেরিয়ে যাবার সুযোগ কিংবা ৮ বছর বয়সী কারো দুই পায়ের মাঝে কেউ হাত দেয়ার সাহসটি কখনোই করবে না।

এম এম মেহেরুল
লেখক ও চেয়ারম্যান,আলোর প্রদীপ
ই-মেইলঃ meharul.islam.1991@gmail.com

No comments

Leave a Reply

one × three =

সর্বশেষ সংবাদ