Menu

মেয়ে ডাক্তার ছেলে সরকারী চাকুরীজীবি তবুও বৃদ্ধাশ্রমে মা, খোঁজ নেয়না কেউ

সোনাতলা সংবাদ ডটকম ডেস্কঃ জীবন সংগ্রামে গার্মেন্টস অথবা স্কুলে আয়ার চাকরি করেছেন। হাতের রান্না ভালো ছিল বলে হাঁকডাকও ছিল আফরুজা বেগমের। বড় কোনো অনুষ্ঠান হলে বাসাবাড়িতে গিয়ে রান্নার কাজ করতেন। এভাবে নানা প্রতিকূলতা পাড়ি দিয়ে দুই ছেলে-মেয়েকে বড় করেছেন। আজ মেয়ে চিকিৎসক, ছেলে সরকারি চাকরিজীবী। সংগ্রামী সেই আফরুজা বেগমের ঠাঁই এখন বৃদ্ধাশ্রমে!

শরীর শুকিয়ে গেছে, বয়সের ভারে ন্যুব্জ আফরুজা বেগম ভুগছেন নানা রোগে। নতুন করে যোগ হয়েছে হাত ভাঙার যন্ত্রণা। জীবন সায়াহ্নে এসে যখন প্রয়োজন ছেলে-মেয়ের আদর ও ভালোবাসা, সেখানে বৃদ্ধাশ্রমে একা পড়ে আছেন তিনি। দেখতে আসেন না ছেলে-মেয়ে।

সাত বছর আগে অর্থাৎ ২০১৪ সালে রাজধানীর কল্যাণপুর পাইকপাড়ায় (বাড়ি- ৪৬২, সড়ক- ৮, দক্ষিণ পাইকপাড়া) ‘চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এইজ কেয়ার’ নিবাসে জায়গা হয় তার। অভিমানী আফরুজা নিজেও আর যোগাযোগ করেননি সন্তানদের সঙ্গে।

সন্তান আসে না তাই আশ্রমের এক সেবককে জড়িয়ে মায়ের কান্না, দূর থেকে তা দেখছেন আশ্রিত বাবারা সরেজমিনে বৃদ্ধাশ্রম পরিদর্শনে কথা হয় আফরুজা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ওরা কেউ আমাকে দেখতে আসে না। তারা জানেও না যে আমি এখানে থাকি। ওদের জন্য খুব কষ্ট হয়, খারাপ লাগে। জীবনে কত কষ্ট করেছি, কিন্তু আমার ব্যাড লাক (দুর্ভাগ্য)। আমি আর পারছিলাম না। তাই বাসা থেকে বের হয়ে যাই। তারপর কেমনে কেমনে এখানে জায়গা হলো!’

অনেক কষ্ট করেছি, কজন মা-ই পারে! কিন্তু আমার ভালো লাগা যে ওরা আজ প্রতিষ্ঠিত, আমি তো এটাই চেয়েছিলাম। আমার তো এক হাত ভাঙা, ওদের জন্য এক হাত তুলে আল্লাহর কাছে দোয়া-মোনাজাত করি, ওরা যেন ভালো থাকে।

আমি বরং এখানেই ভালো আছি বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রিত মা আফরুজা বেগম
তিনি বলেন, “অনেক কষ্ট করেছি, কজন মা-ই পারে! কিন্তু আমার ভালো লাগা যে ওরা আজ প্রতিষ্ঠিত, আমি তো এটাই চেয়েছিলাম। আমার তো এক হাত ভাঙা, ওদের জন্য এক হাত তুলে আল্লাহর কাছে দোয়া-মোনাজাত করি, ওরা যেন ভালো থাকে। আমি বরং এখানেই ভালো আছি।”

‘চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এইজ কেয়ার’ বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রিত মায়েরা
শুধু আফরুজা বেগমই নন— এমন আরও অর্ধশত (৫৭) বৃদ্ধ মায়ের আশ্রয় এখন কল্যাণপুরের ‘চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এইজ কেয়ার’-এ। তাদের কারোরই এই বৃদ্ধাশ্রমে আসার গল্প স্বাভাবিক নয়। হতভাগা সন্তানরা তাদের ফেলে গেছেন রাস্তায়, মাজারে কিংবা হাসপাতালে। সেখান থেকে তাদের ঠাঁই এই আশ্রমে।

বৃদ্ধাশ্রম সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির আশ্রয়ে রয়েছে ১০৭ বৃদ্ধ মা ও বাবা। এছাড়া পরিচয়হীন অসহায় ও প্রতিবন্ধী ১৮ শিশুর ঠাঁই হয়েছে এখানে। অজ্ঞাত শতাধিক ব্যক্তির দাফন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। মানবসেবায় প্রায় এক দশক ধরে কাজ করে যাচ্ছেন ‘চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এইজ কেয়ার’-এর প্রতিষ্ঠাতা মিল্টন সমাদ্দার।

স্বামী মারা গেছে বহুকাল, চার বছর ধরে এই আশ্রমে আছি। সন্তানদের কথা আর মনে পড়ে না। এখানেই ভালো আছি। মিল্টনই এখন আমার সন্তান বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রিত মা সালেমা আমজাদ ভবনটির নিচ তলায় আরও তিন মায়ের সঙ্গে থাকেন সালেমা আমজাদ। সৌদি আরবের একটি হাসপাতালে একসময় আইসিইউ নার্স হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

একপর্যায়ে বয়স বাড়ায় চাকরি ছাড়েন সন্তানদের আদর-যত্নে থাকবেন ভেবে। কিন্তু একে একে চার ছেলে ও এক মেয়ে চলে যান লন্ডনে। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে থাকা ফরিদপুরের এই বৃদ্ধ মাকে খবর পেয়ে নিয়ে আসেন চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এইজ কেয়ারের কর্মীরা।

সন্তানরা খোঁজ নেয় না, বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রিত মায়েরা তাই একে-অপরের খোঁজ নেন, কুশল বিনিময় করেন কথা হয় সালেমা আমজাদের সঙ্গে। বলেন, ‘স্বামী মারা গেছে বহুকাল…, চার বছর ধরে এই আশ্রমে আছি। সন্তানদের কথা আর মনে পড়ে না। এখানেই ভালো আছি। মিল্টনই এখন আমার সন্তান।’

সত্তরোর্ধ্ব সোনা বানুর কষ্ট যেন আরও বেশি। ২০১৭ সালের এক রাতে মুগদার সড়কে ফেলে রেখে যান সন্তানরা। এরপর স্থানীয়দের খবরে অসুস্থ মা সোনা বানুকে নিয়ে আসা হয় আশ্রমে। ২০১৯ সালে বড় মেয়ে খোঁজ পেয়ে আসেন। প্রমাণ-পত্র দেখিয়ে মাকে বাসায় নিয়ে যান। এক বছর পর আবারও মুগদা থেকে ওয়াসাকর্মীদের ফোন। গভীর রাতে সোনা বানুর কান্নাজড়িত আকুতি। পরিচয় জেনে আবারও তাকে নিয়ে আসা হয় আশ্রমে। সেই থেকে অভিমানী সোনা বানু রয়ে গেছেন চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এইজ কেয়ারে।

ছেলে নেই, মেয়েরা দেখা করতে আসে না। বড় মেয়ে স্কুলশিক্ষিকা। খোঁজও নেয় না। যদি ওরা নিয়ে যেত, নাতি-নাতনিদের দেখতাম, ভাল লাগত। কিন্তু ওরা কেউ আমাকে নিয়ে যায় না বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রিত মা সোনা বানু নানা ব্যধিতে আক্রান্ত চার মেয়ের জননী সোনা বানু বলেন, ‘ছেলে নেই, মেয়েরা দেখা করতে আসে না। বড় মেয়ে স্কুলশিক্ষিকা। খোঁজও নেয় না। যদি ওরা নিয়ে যেত, নাতি-নাতনিদের দেখতাম, ভালো লাগত। কিন্তু ওরা কেউ আমাকে নিয়ে যায় না।’

অভিমানী আফরুজা বেগম নিজে থেকে আর যোগাযোগ করেননি সন্তানদের সঙ্গে, ঢাকা পোস্টকে জানান তিনি পাশের বিছানায় বসে ছিলেন বিবি খদেজা বেগম (৯০)। পাঁচ বছর ধরে এখানে তিনি। ১৭ বছর আগে স্বামীকে হারিয়ে নারায়ণগঞ্জ ছেড়ে ঢাকায় আসেন। অধিকাংশ সময় ভিক্ষা করেছেন। বয়স বাড়ায় জ্ঞান হারিয়ে রাস্তায় পড়ে থাকতেন। দেখভালের মতো কেউ নেই বিবি খদেজার। বলেন, ‘উপরে আল্লাহ আছে। আল্লাহ-ই আমাকে এখানে পাঠাইছে। আমি এখানে ভালো আছি। মিল্টন সমাদ্দার এখন আমার সন্তান।’

রাস্তায় পড়ে থাকা বৃদ্ধদের দেখে সহ্য হয়নি। আশ্রয় দিয়েছি। এভাবে একজন, দুজন করে আজ শতাধিক মানুষকে একই ছায়ায় রেখেছি। আমি মনে করি, মানুষ কখনো রাস্তায় পড়ে থাকতে পারে না। চেষ্টা করছি পরিচয়হীন, অজ্ঞাত, অসুস্থ, রাস্তায় পড়ে থাকা বৃদ্ধ এবং প্রতিবন্ধী ও অসহায় শিশুদের পাশে দাঁড়াতে মিল্টন সমাদ্দার, পরিচালক, চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এইজ কেয়ার জীবন সায়াহ্নে এসে যখন প্রয়োজন ছেলে-মেয়ের আদর ও ভালোবাসা তখন এসব বৃদ্ধ মায়েদের স্থান বৃদ্ধাশ্রমে
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মিল্টন সমাদ্দার ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘মানুষ মানুষের জন্য। আমি নিজে এটা পরিকল্পনা করে করিনি। রাস্তায় পড়ে থাকা বৃদ্ধদের দেখে সহ্য হয়নি। আশ্রয় দিয়েছি। এভাবে একজন, দুজন করে আজ শতাধিক মানুষকে একই ছায়ায় রেখেছি। আমি মনে করি, মানুষ কখনো রাস্তায় পড়ে থাকতে পারে না। চেষ্টা করছি পরিচয়হীন, অজ্ঞাত, অসুস্থ, রাস্তায় পড়ে থাকা বৃদ্ধ এবং প্রতিবন্ধী ও অসহায় শিশুদের পাশে দাঁড়াতে।’

বিশেষ করে যারা চলাফেরার ক্ষমতাটুকু হারিয়ে অচল হয়ে পড়েছেন কিংবা শরীরে পচন ধরেছে, তাদের সুস্থ করে স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দিতেই যেন আপ্রাণ চেষ্টা মিল্টন সমাদ্দারের।

No comments

Leave a Reply

fifteen − four =

সর্বশেষ সংবাদ