Menu

১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর ফুলছড়িতে হানাদার বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন গাবতলীর কৃতি সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা বাদলঃ তার স্মৃতিচারনে কৃষিবিদ বীরমুক্তিযোদ্ধা ড. মোঃ শাহজাহান

সোনাতলা সংবাদ ডটকম (আমিনুর ইসলাম): বিজয়ের এ মাসটি আনন্দের হলেও আমার জন্য খুব বেদনাদায়ক কারণ চূড়ান্ত বিজয়ের মাত্র ১২ দিন আগে ৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে ঘটে যায় এক মর্মান্তিক রক্তক্ষয়ী সম্মুখ যুদ্ধ, যা আমার জীবনে এক তাৎপয্যপূর্ণ ও স্মরনীয় ঘটনা।

এ দিনে গাঁইবান্ধা জেলার ও উত্তরঅঞ্চলের মধ্যে ফূলছড়ি ও সাঘাটার অধিকাংশ এলাকা প্রথম স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করা হয় এবং মুক্তি লাভ করে। এই যুদ্ধে আমি ড. মোঃ শাহজাহান ও শহীদ বাদলসহ প্রায় ৫০০ (পাঁচ শত) জন মুক্তিযোদ্ধা অংশগ্রহণ করি। রুস্তম কোম্পানির লিডারগণ এ যুদ্ধ পরিচালনা করে।

কি ঘটেছিল সেদিন ? ৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ সারাদিন যুদ্ধের পর শোচনীয় পরাজয়ে পাক বাহিনী সৈন্যরা ফুলছড়ি থানা অতিক্রম করে পাশর্^বর্তী সাঘাটার গোবিন্দী ও পাখীমারা এলাকার ওয়াপদা বাঁধে ছড়িয়ে পরে এবং এলাকায় অবস্থান নেয়। আমরা বিভিন্ন সোর্সের মাধ্যমে পাকসেনাদের গতিবিধি লক্ষ্য করতে থাকি।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্লাটুন কমান্ডারা তাদের অধীন সকল যোদ্ধাকে যাথাযথ প্রস্তুতি নিতে বলেন। গোলনার চরে মোঃ সাবেত আলী মেম্বারের বাড়ীর উঠানে ‘ফল ইন’ বা সারিবদ্ধ করা হয়।

দাপ্তারিক কাজে কোম্পানি কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা রুস্তম আলী খন্দকার ঐ দিন সেক্টর কমান্ডার স্কোয়াড্রন লিডার এম. হামিদুল্লাহ খানের সাথে মাইনকার চর (ভারত) যুদ্ধ কৌশল নিয়া আলোচনার জন্য অবস্থান করেন। তাই সহকারী কোম্পানি কমান্ডার গৌতম চন্দ্র মোদক এর নেতৃত্বে এ যুদ্ধ পরিচালিত হয়।

এ যুদ্ধের নেতৃত্ব দানকারী প্লাটুন কমান্ডাররা হলেন ৬ জন। (১) সামুছুল আলম (২) এনামুল হক (৩) মহাসিন আলী (৪) নাজিমউদ্দিন (৫) তসলিম হাবিলদার ও (৬) ময়েজ উদ্দিন। বিশেষ ভূমিকা রাখেন সেকশান কমান্ডার হিসেবে জাহিদুর রহমান বাদল।

গোয়ালনার চর থেকে ফুলছড়ি ঘাট : বিকাল ৩ ঘটিকায় ৬ জন কামান্ডার নেতৃত্বে ভাগ হয়ে ফুলছড়ি ঘাটে খান সেনাদের আক্রমনের উদ্দেশ্যে রওনা হই। বিকালের মধ্যে প্রায় ৫ শতাধিক বীরমুক্তিযোদ্ধা ফুলছড়ি ঘাটের আশে পাশে পৌঁছায়। এ সময়ের মধ্য ৩টি যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

প্রথম যুদ্ধ সাঘাটা ও ফুলছড়ি থানার যৌথ সীমানা সংলগ্ন ঘাঁঘট রেল ও রোড ব্রিজে, হানাদার বাহিনীদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধ শুরু হয়। এখান থেকে হানাদারদের সরিয়ে মুক্তিযোদ্ধরা প্রতিরক্ষা বাঁধ এলাকায় ঢুকে পরে। একপ্লোসিভ গ্রেনেট ও বোমের আঘাতে পাকবাহিনীর মোনবল একেবারেই ভেঙ্গে যায়। দিনের বেলায় এত অধিক সংখক মুক্তিযোদ্ধাদের দেখে তারা প্রাণ ভয়ে পালাতে শুরু করে। তারা জিপ গাড়ীর বহর ফেলে রেখে পালাতে থাকে। প্রচন্ড গুলি বর্ষনে খান সেনারা ফুলছড়ি থানার সীমানা পেরিয়ে ওয়াপদা বাঁধ দিয়ে সাঘাটার পাখীমারার দিকে পালিায়ে যায়।

এ সময় এলাকার মুক্তি পাগল মানুষেরা তারা কয়েকজন পাক সেনাদেরকে ধরে ফেলে। কিন্তু হানাদাররা ৩ জন নিরস্ত্র গ্রামবাসিকে হত্যা করে পালিয়ে যায়। ইতিমধ্যে সন্ধ্যা আসতে থাকে এক দিকে ৫ শত মুক্তিযোদ্ধা অন্য দিকে ২৫ তম পাঞ্জাব রেজিমেন্টের ৩টি গাড়ি সাঘাটার দিক থেকে ফুলছড়ির দিকে আসতে থাকে। মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা পাক হানাদারদের থেকে প্রায় অনেক বেশি।

মুক্তিযোদ্ধাদের ক্রমাগত ধাওয়ার মুখে ৫-৭ মাইল ভিতরে চলে যায় হানাদার বাহিনি। ইতিমধ্য সন্ধ্যা নেমে আসে, ৪ ডিসেম্বর ১৯৭১, রাতটি ছিল আমবশ্যার। ঘোর অন্ধ্যকার, পথ ঘাট কিছুই দেখা যাচ্ছিলো না। যুদ্ধের কৌশল হিসেবে মুক্তিযোদ্ধাগণ তাদের ‘ঘাঁটি’ গলনার চরে ফেরার প্রস্তুতি নেয়।

মুক্তিযোদ্ধাদের এনামুল প্লাটুন ও সেকশন কমান্ডার জাহিদুর রহমান বাদলের দলবল ওয়াবদা বাধের উপর দিয়ে গলনাচরে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়। হঠাৎ বিপরিত দিক থেকে ওঁৎ পেতে থাকা পাকসেনার একটি কোম্পানির মুখামুখি হয়। অন্ধ্যকারে উভয় কেউ কাউকে চিনতে না পেরে নিজেদের সহযোদ্ধা মনে করে কোলা-কোলি ও করমর্দন করতে থাকে।

হঠাৎ ভূল ভেঙ্গে যায় কমান্ডার এনামুল হক এবং বাদলের। পাকসেনারা (হুংকার দিয়ে বলতে থাকে ‘হ্যান্ডস আপ’ ‘হাতিয়ার ডলদো’)। এ্যাটাক বলে গর্জন দিয়ে উঠলে মুহূর্তে মুক্তিযোদ্ধারা স্ট্রেনগান ও রাইফেলের বাট উটিয়ে শত্রুদের সাথে হাতা-হাতি শুরু করে। এ সময় অন্ধ্যকারে গুলি ছোরা অসম্ভাব ছিল, শত্রুরা এত কাছে ছিল শুধু মাত্র বেয়নেট চার্জ করতে হয়েছিল।

অন্ধ্যকারে পাঞ্জাবিদের লম্বা দেহ ও খাকি পোশাক আন্ধাজ করে মুক্তিযোদ্ধারা তাদের হত্যা করতে থাকে। ইতিহাসের এই রক্তক্ষয়ী সম্মুুখ যুদ্ধের এক পর্যায় শত্রুদের নিধন করতে করতে বাদল গুলিবিদ্ধ ও বেয়নেট চার্জে আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পরে।

সে সময় চিৎকার করে ডাকতে থাকে (পুটু তুই কোথায় আমাকে ওরা হত্যা করছে তুই তারাতারি আমার কাছে আয়)। কিন্তু আমি তার ডাকে সারা দিতে পারিনি কেননা আমরা তার কাছ থেকে দূরে অবস্থান করতেছিলাম। শহীদ বাদল (১৯৭০), মোঃ শাহজাহান পুটু (১৯৭২)

জাহেদুর রহমান বাদল, পিতা- মোস্তাফিজুর রহমান (দুদু মিয়া), মাতা- গোলেনুর বাণু, ১৫ নভেম্বর ১৯৫৩ জন্ম, গ্রাম- উনচুরখী (মন্ডল বাড়ী), উপজেলা- গাবতলী, জেলা- বগুড়া। ১৯৬৯ এসএসসি প্রথম বিভাগ গাবতলী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, ১৯৭১ বগুড়া আজিজুল হক কলেজ, পিতা-মাতার বড় ছেলে, মৃত- ৪ ডিসেম্বর ১৯৭১।

শহীদ বাদলের গর্বিত মাতা, গোলেনুর বাণু কৃষিবিদ ড. মোঃ শাহজাহান পুটু (বীরমুক্তিযোদ্ধা)।এ যুদ্ধে ২৭ জন পাকসেনা নিহত এবং অর্ধশত জন আহত হয়। আর মুক্তিযোদ্ধাদের ৫ জন শহীদ ও ২৫ জন আহত হয়। পর দিন ৫ জন মুক্তিযোদ্ধার লাশ খুঁজে কোম্পানির সাহসী যোদ্ধারা পাশর্^বর্তী সগুনা ইউনিয়নের ধনারুহা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শহীদদের দাফন কাফনের মাধ্যমে করাস্থ করা হয়।

৪ ডিসেম্বর ঐ যুদ্ধে যে পাঁচ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন তারা হলেন:- (১) সেকশন কমান্ডার জাহেদুর রহমান বাদল (গাবতলী, বগুড়া) (২) আফজাল হোসেন (৩) আব্দুস সোবাহান (৪) ওসমান গণি ও (৫) কাবেজ আলী। যুদ্ধ শেষে স্বাধীনতার পর কোম্পানির কমান্ডার রোস্তম আলী খন্দকার শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের কবর পাকা করার ব্যবস্থা করেন।

পরবর্তী সময় একটি শহীদ মিনার নির্মান করা হয়। এর পর থেকে প্রতিবছর ৪ ডিসেম্বর দিবসটি সরকারি আনুষ্ঠানিক ভাবে আঞ্চলিক বিজয় ও শোকদিবস হিসেবে উৎযাপিত হয়। সরকারি গ্রেজেটের মাধ্যমে ১৯৮৫ সালে সগুনা ইউনিয়নের নাম পরিবর্তন করে মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্তের স্মৃতি স্বরনীয় করে রাখতে এ ইউনিয়নের নাম ‘মুক্তিনগর’ করা হয়।

আজও বগুড়ার ছেলে জাহিদুর রহমান বাদল ঘুমিয়ে আছে সাঘাটা উপজেলার মুক্তিনগর গ্রামে। আমি তাদের যুদ্ধের স্বাক্ষী হিসেবে আজও বেঁচে আছি। বাদলসহ আমার সহযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের বেদনা নিয়ে ৪ ডিসেম্বরের স্মৃতি চারন করছি। মহান আল্লাহ্ কাছে দোয়া করি বাদল ভাইসহ অন্যান্য যারা দেশের জন্য শহীদ হয়েছেন, আল্লাহ তুমি তাদের রহম কর, কবুল কর, মাফ করো।

No comments

Leave a Reply

1 × 4 =

সর্বশেষ সংবাদ